পথশিশু

কেমন আছে আমাদের পথকলিরা?

লেখক

স্নিগ্ধা মৌ

বিভাগ

বাংলা কন্টেন্ট

ব্যাচ নাম্বার

বাংলা কন্টেন্ট – ১

শ্রেণী

নিবন্ধ

5/5

ভয়ংকর এক দুঃসময় পার করছি আমরা, অদৃশ্য এক শক্তির সাথে লড়াই। তবে বিশ^াস করি জয় হবেই, এই মহামারী ভাইরাসকে আজ না হয় কাল আমরা ঠিকই বশে আনতে পারবো। কিন্তু আমাদের ভিতরের যে অমানবিকতাগুলো রয়েছে, যে নৃশংসতা রয়েছে, ঘুণপোকার মতো আমাদের ভিতরকে ঝাঁঝরা করে ফেলছে, সেগুলো কি কোনদিনই বিদায় নিবে আমাদের থেকে? আদৌ কি আর কখনো, কোনদিন আমরা মানুষ হয়ে উঠতে পারবো? অত্যন্ত সচেতন থেকেও আমরা রক্ষা করতে পারছি না আমাদের ছোট ছোট সোনামনিদের, তবে কেমন আছে আমাদের পথকলিরা? কেমন ভাবেই বা নিজেদের রক্ষা করছে কন্যা পথশিশুরা?


বাাংলাদেশ জাতীয় শিশুনীতিতে ১৪ বছরের কম বয়সী ছেলেমেয়েদের এবং বাংলাদেশ সংবিধানে ০-১৮ বছরের কম বয়সী সকলকে শিশু হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইউনিসেফের মতে, পথশিশু বলতে, যে সকল শিশুর জন্য রাস্তা বসবাসের স্থান অথবা জীবিকার জন্য উপায় হয়ে গেছে তাদের পথশিশু বলে। ধর্ষণের সংঙ্গা? না, সে সংঙ্গা আমি দিতে চাই না, আমি আমার কলমের আঁচড়ে ব্যাখা করতে অক্ষম এক নরপশুর চরম নৃশংসতার সংঙ্গা। তবে ছোট পরিসরে কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরতে চাই। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর হিসাব মতে, ২০১৭ সালে ৮১৮ জন এবং ২০১৮ সালে ৭৩২ জন নারী র্ধষনের শিকার হয়েছে। ২০১৮ সালের চেয়ে শিশু ধর্ষণের পরিমান বেড়েছে ৭৬ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিমাসে গড়ে ৮৪টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে (সূত্র: বাংরাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম)। ২০২০ সালের শুধুমাত্র জুন মাসেই সারা দেশে ৩০৮ জন নারী ও কন্যা শিশুর ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে (সূত্র: জাগোনিউজ২৪.কম)। ২০২১ সালের শুধুমাত্র জানুয়ারি মাসে ২৫৯ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার, ধর্ষণের শিকার ১০৮ জন (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন)। আমরা নাকি মহামারীর মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, আমরা নাকি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে দাড়িয়ে আছি। আমরা নাকি সৃষ্টিকর্তার কাছে মহাপ্রলয়ের অবসানের জন্য অনুনয় করছি। তবে কেন এখনো করোনা আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতালের মধ্যেই চলছে ধর্ষনের চেষ্টা? এই ক্রান্তিলগ্নেও আমরা নারীরা, কন্যা শিশুরা শুধুই এক কামনার বস্তু, মানুষ না নিছকই এক নারী মাংস।
ফিরে যাই ২০২০ সালের প্রথম দিকে, বছরের প্রথম ১০ দিনে দেশে ১২৮ টি ধর্ষন হয়। সারা বছরে তাহলে কতগুলো ধর্ষন হয়? না আমি এই হিসাব করতে অক্ষম। তবে আমি চাই আপনি/আপনারা হিসাব করুন। আর সংখ্যাটা দেখে স্তব্ধ হয়ে উঠুক আপনার ইন্দ্রিয়, আপনার হাত-পা অবশ হয়ে আসুক, আপনার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠুক। নিজেন মা, বোন, স্ত্রী আর মেয়ের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠুক আপনার প্রাণ। আমি চাই, সত্যিই তাই চাই। আসুন এবার আরো একটু গভীরভাবে চিন্তা করি। এগুলো সবই নথিভুক্ত ধর্ষণের হিসাব। নথিভুক্ত হয়নি এমন ধর্ষনের সংখ্যা তবে কত? মুখ বুজে মেনে নেয়া সংখ্যাটা আপনি আমি হিসাব করেও বের করতে পারবো না। বীভৎস এক স্মৃতি নিয়ে তারা সারাজীবন তিলতিল করে শেষ হয়ে যায় নীরবে, নিভৃতে।
চলে যাই মূল প্রসঙ্গে, আমরা অনেক সচেতন হয়েছি। আমরা আমাদের শিশুদের এখন অনেক বেশি সর্তকতায় রাখি। একা একা কোথাও যেতে দেই না, অপরিচিত মানুষের কাছে তো নয়ই। কিন্তু ঐ সব পথকলিদের কি হবে? যখন আপ্রাণ চেষ্টা করেও আমরা সুরক্ষিত রাখতে পারছি না আমাদের পরিবারে থাকা শিশুদের, তখন ঐ মানুষরূপী পশুদের হাত থেকে কেমন করে সুরক্ষিত আছে আমাদের কন্যা পথশিশু? কি ভয়াল থাবার অপেক্ষায় দিন গুনছে কিংবা নিঃশব্দে মেনে নিছে পৈশাচিক আক্রমণ। তাদের নিপীড়নের জন্য রাতের অন্ধকারটুকুই হয়তো যথেষ্ট। আমরা আমাদের শিশুকে ভাল স্পর্শ, মন্দ স্পর্শ, অনাকাক্ষিত স্পর্শের শিক্ষা দিচ্ছি, শেখাচ্ছি ধর্ষণ কাকে বলে। কিন্ত ওই পথের ধারের ফুলগুলো? ওরা কি জানে ওদের অধিকার কি কি? ওদের সাথে যেগুলো ঘটে সেটা আসলে অন্যায়? ওদেরও অধিকার আছে প্রতিবাদ করার, সুস্থ জীবন যাপনের অধিকার। একটা বিষয় কি কখনো খেয়াল করেছেন? একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর আর রাস্তায় মেয়ে পথশিশুদের দেখতে পাওয়া যায় না। আমরা যদি ধরে নেই, ওদের বিয়ে হয়ে গেছে, এ বাল্যবিবাহও যেন আশির্বাদ। কিন্তু যদি সেটা না হয়। আসলেই কি তাদের নিয়ে কেউ সংসার গড়ে? তাহলে??? তাহলে কি ঠাঁই হয় কোন অন্ধগলিতে? লাভের মধ্যে লাভ, ছোটবেলায় কেউ যখন জোর করতো হয়তো ঐ ছোটফুলগুলো বুঝতেও পারতো না কি হচ্ছে। আর এখন এগিয়ে যায় নিজেই বাধ্য হয়ে, জীবিকার প্রয়োজনে। আমাদের কি সত্যিই কোন দায়বদ্ধতা নেই? আমাদের কি সত্যিই কিছু করনীয় নেই?

আর কত? সত্যিই আর কত? জান্নাতের ফুলগুলোর মধ্যেও আমরা যৌনতা খুঁজি। মাঝে মাঝে মনে হয় সত্যিই ভাল হয়েছে করোনা নামক প্রাণঘাতী ভাইরাসের এই আক্রমণে। আসলেই দরকার ছিল এই মহামারীর । আমরা আর মানুষ নেই, আমাদের বেঁচে থাকার কোন অধিকারও আর নেই। আমার বিশ্বাস অদৃশ্য যে শয়তানের কথা আমরা বলি, সেও বোধহয় আমাদের নৃশংসতা দেখে শিউরে ওঠে।

তবে সমাধান কি? পথশিশুদের নিরাপত্তা দিতে হবে. পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে, সরকারী-বেসরকারী সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। তারপর! তারপর মেয়েদের ঘরে আটকে রেখে বলতে হবে বাইরে রয়েছে মানুষরূপী পিশাচ। সমাধান কি শুধু মেয়েদের আগলে রেখে হবে? প্রতিরোধের জন্য চেষ্টা করতে হবে বহুমাত্রিকভাবে। আপনার মেয়েকে সচেতন করার আগেই আপনার ছেলেকে শেখান কিভাবে নারীকে সম্মান করতে হয়, শেখান নারীও একজন মানুষ, যার ইচ্ছে আছে। মায়েরা নিঃসংকোচে তাদের পুত্র সন্তানকে শোনাক তাদের মেয়েবেলার গল্প। কেমন লাগত ঐ নোংরা দৃষ্টি, ভাষা আর অযাচিত স্পর্শ। পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় ভাবে স্বীকৃতি দিন যে, ছেলেদের এই শিক্ষার প্রয়োজন আছে। হয়তো পরিপূর্ন সমাধান এটা নয় তবুও বলতে তো পারবো চেষ্টা করেছিলাম। আমি-আপনি হয়তো মানূষ হতে পারলাম না, তবু ভবিষৎ প্রজন্মকে মানুষ করার চেষ্টা করি, যেন ওরা বলতে পারে আমরা মানুষ, মানুষরূপী কোন পশু না।

Share to spread knowledge
Share on facebook
Share on linkedin
Share on pinterest
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on tumblr
Share on email
Share on telegram

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *