কোরআন ও বিজ্ঞানের আলোকে "মানবদেহের বিভিন্ন উপাদানের রহস্য।"
লেখক
মোঃহারুনুর রশীদ
বিভাগ
ইসলামিক
ব্যাচ নাম্বার
কোরআন গবেষণা
(ব্যাচ – খালিক ) ও
মানব সৃষ্টির রহস্য
(ব্যাচ – খালিক )
শ্রেণী
গবেষণা
🔸সারাংশঃ পক্ষান্তরে জ্ঞানসমৃদ্ধ পূর্ণ ঈমান দীপ্ত মানুষ অবশ্যই নিজের শারীরিক গঠন এর বিকাশ এবং এর কার্য নৈপুণ্যতা নিয়ে গভীর গবেষণা করে থাকে তাই আল – কুরআন একনিষ্ঠ বিশ্বাসী জ্ঞানী এবং চিন্তাশীল লোকদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছে, ‘একনিষ্ঠ বিশ্বাসীদের জন্য পৃথিবীতে রয়েছে যেমন অসংখ্য প্রমাণ তেমনি তোমাদের নিজেদের মধ্যেও রয়েছে অনেক নির্দেশনা । তারপরেও কি তোমরা তা দেখবে না?’
🔸বিষয়বস্তুঃ
১.০মানব দেহের বিভিন্ন উপাদানের রহস্য
(The Secret of the various components of the Human Body)
♦️ ১.১মানবদেহের রাসায়নিক উপাদান
আল্লাহ পাক বলেন –
وَفِى ٱلْأَرْضِ ءَايَٰتٌ لِّلْمُوقِنِينَ–وَفِىٓ أَنفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ
” As also in your own selves: Will you not then see?On the earth are signs for those of assured Faith,”
অর্থঃ”বিশ্বাসকারীদের জন্যে পৃথিবীতে নিদর্শনাবলী রয়েছে,এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও, তোমরা কি অনুধাবন করবে না?”
(সূরা যারিয়াতঃ২০/২১)
মানবদেহের কি কি নিদর্শন সমগ্র দেহকে সুগঠিত করেছি তা সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলোঃ
পৃথিবীতে মানুষের বেঁচে থাকার জন্যে প্রায় ৩০ টি উপাদান একান্ত প্রয়োজনীয় । তারা অণু হিসেবে দেহের তরল পদার্থের মধ্যে থাকে । মানুষের শরীরকে সচল রাখার জন্যে এই ৩০ টি উপাদান হলো- আর্সেনিক , ব্রোমিন , ক্যাডমিয়াম , ক্যালসিয়াম , কার্বন , ক্লোরিন , ক্রোমিয়াম , কোবাল্ট , তামা , ফ্লুয়োরিন , হাইড্রোজেন , আয়োডিন , লোহা , লিবিয়াম , ম্যাগনেসিয়াম , ম্যাঙ্গানিজ , মলিবডিনাম , নিকেল , নাইট্রোজেন , অক্সিজেন , ফসফরাস , পটাসিয়াম , সেলেনিয়াম , সিলিকন , সোডিয়াম , স্ট্রংটিয়াম , গন্ধক , টিন , ড্যানাডিনাম ও জিংক বা দস্তা । এর মধ্যে হাইড্রোজেন ( ৬৩ % ) , অক্সিজেন ( ২৫ % ) , কার্বন ( ১০ % ) ও নাইট্রোজেন ( ১.৪ % ) এর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি এবং তারা একসঙ্গে শরীরের মোট mass বা ভরের পরিমাণের শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি । আয়োডিন , সেলেনিয়াম , তামা ও ফ্লুয়োরিন খুব কম মাত্রায় ( দশ লক্ষ ভাগের ১০ ভাগেরও কম ) থাকে।
♦️ ১.২ বিস্ময়কর মানুষ সৃষ্টির উপাদান
প্রথম মানুষ হযরত আদম ( আ.) কে আল্লাহ তা’আলা সরাসরি মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন । কুরআনে এ মাটিকে কাদামাটি, পোড়ানো শুকনো মাটি , মাটির নির্যাস ইত্যাদি অভিধায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে । এগুলো ছিল মাটি থেকে হযরত আদম ( আ.) – এর দেহ সৃষ্টি পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায় । হযরত আদম ( আ . ) – এর দেহ সৃষ্টির পর আল্লাহ সে দেহ থেকে হযরত হাওয়া ( আ.) কে সৃষ্টি করেছেন । এরপর পুরুষ ও নারীর মিলনে উদ্ভূত শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনে মানুষের জন্মলাভের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে দিয়েছেন , সেখানেও কোনো না কোনোভাবে প্রভাব বিদ্যমান থাকছে মৃত্তিকাজাত উপাদানের। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা’আলা বিভিন্নভাবে মানুষের সৃষ্টির এ উপাদানসমূহ সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। যেমন-
(ক)মানুষকে মাটি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছেঃ আল্লাহ তা’আলা বলেছেন-
وَمِنْ ءَايَٰتِهِۦٓ أَنْ خَلَقَكُم مِّن تُرَابٍ
“Among His Signs in this, that He created you from dust;”
অর্থঃ “তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে এক নিদর্শন এই যে, তিনি মৃত্তিকা থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছেন।”
(সূরাঃআল-রুম,আয়াতঃ২০)
ٱلَّذِىٓ أَحْسَنَ كُلَّ شَىْءٍ خَلَقَهُۥ وَبَدَأَ خَلْقَ ٱلْإِنسَٰنِ مِن
طِينٍ
” He Who has made everything which He has created most good: He began the creation of man with (nothing more than) clay,”
অর্থঃ “যিনি তাঁর সৃষ্টিকে সুন্দর করেছেন এবং কাদামাটি থেকে মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন।”
(সূরা আস-সাজদাহ,আয়াতঃ৭)
(খ)মানুষকে পোড়া মাটির মত শুকনো মাটি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছেঃ আল্লাহ তা’আলা বলেছেন-
خَلَقَ ٱلْإِنسَٰنَ مِن صَلْصَٰلٍ كَٱلْفَخَّارِ
“He created man from sounding clay like unto pottery.”
অর্থঃ “আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পোড়া মাটির ন্যায় শুষ্ক মৃত্তিকা থেকে।”
(সূরা আর-রাহমান,আয়াতঃ১৪)
(গ)মানুষকে মাটির নির্যাস থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে :
وَلَقَدْ خَلَقْنَا ٱلْإِنسَٰنَ مِن سُلَٰلَةٍ مِّن طِينٍ
“Man We did create from a quintessence (of clay)”
অর্থঃ “আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি।”
(সূরা আল-মুমিনুন,আয়াত :১২)
(ঘ) মানুষকে শুকনো কাদামাটি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছেঃ আল্লাহতালা বলেছেন-
وَلَقَدْ خَلَقْنَا ٱلْإِنسَٰنَ مِن صَلْصَٰلٍ مِّنْ حَمَإٍ مَّسْنُونٍ
“We created man from sounding clay, from mud moulded into shape;”
অর্থঃ”আমি মানবকে পচা কর্দম থেকে তৈরী বিশুস্ক ঠনঠনে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছি।”
(সূরা আল-হিজর,আয়াতঃ২৬)
(ঙ)মানুষকে আঠালো মাটিতে সৃষ্টি করা হয়েছে: আল্লাহ তা’আলা মানুষকে আঠালো মাটিতে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেছেন-
إِنَّا خَلَقْنَٰهُم مِّن طِينٍ لَّازِبٍ
“I created them from sticky clay!”
অর্থঃ “আমিই তাদেরকে আঠালো মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি”
(সূরা সাফফাত,আয়াতঃ১১)
(চ)মানুষকে পানি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছেঃ আল্লাহ ‘তালা বলেছেন-
وَهُوَ ٱلَّذِى خَلَقَ مِنَ ٱلْمَآءِ بَشَرًا
“It is He Who has created man from water.”
অর্থঃ “তিনিই পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন মানবকে।”
(সূরা আল-ফুরকান,আয়াতঃ৫৪)
(ছ)মেরুদণ্ড ও পাজরের মধ্য থেকে নির্গত তরল থেকে মানুষের সৃষ্টি : আধুনি জননেন্দ্রিয়গুলো যেমন পুরুষের শুক্রাণু ও নারীর ডিম্বাশয় , কিডনির কাছে মেরুদণ্ড স্তম্ভ এবং সহস্রাধিক পাঁজরের হাড়ের মধ্যে বিকশিত হওয়া শুরু করে । এরপর সেগুলো ক্রমশ নিচে নেমে আসে । স্ত্রীর ডিম্বাশয় মেরুদণ্ডের নিচে ও নিতম্বের মাঝখানে অস্থি কাঠামোর মধ্যে এসে থেমে যায় । কিন্তু পুরুষের শুক্রাণু উরুর গোড়ার নালী দিয়ে অণ্ডকোষের থলিতে নেমে আসার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখে । এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর জননেন্দ্রিয় নিচে নেমে আসার পরও মেরুদণ্ড ও বক্ষ পাঁজরের মাঝে অবস্থিত উদরসংক্রান্ত ধমনি থেকে এ অঙ্গগুলো উদ্দীপনা ও রক্ত সরবরাহ গ্রহণ করে । এ কাজে সহায়ক হিসেবে রসজাতীয় পদার্থ বহনকারী নালী ও শিরাগুলো একই এলাকায় গিয়ে মিলিত হয় । মানুষের জন্মগ্রহণের এ প্রক্রিয়া নির্দেশ করে আল – কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন :
فَلْيَنظُرِ ٱلْإِنسَٰنُ مِمَّ خُلِقَ-خُلِقَ مِن مَّآءٍ دَافِق–يَخْرُجُ مِنۢ بَيْنِ ٱلصُّلْبِ وَٱلتَّرَآئِبِ
“Proceeding from between the backbone and the ribs:He is created from a drop emitted-Now let man but think from what he is created!”
অর্থঃ “এটা নির্গত হয় মেরুদন্ড ও বক্ষপাজরের মধ্য থেকে।সে সৃজিত হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি থেকে।অতএব, মানুষের দেখা উচিত কি বস্তু থেকে সে সৃজিত হয়েছে।”
(সূরা আত-তারিক,আয়াত৫-৭)
(জ) মানুষকে নুতফাহ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে : সাম্প্রতিককালে অণুজীববিজ্ঞান দৃঢ়ভাবে এ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে যে , একটি ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করার জন্য গড়ে ৩০ লক্ষ শুক্রাণু থেকে মাত্র ১ টি শুক্রাণু আবশ্যক । অর্থাৎ ডিম্বাণু নিষিক্তকরণের জন্য প্রয়োজন নির্গত শুক্রকীটের ০.০০০০৩% বা তিন মিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ ! আল – কুরআনে মানুষ সৃষ্টির এ অতি অল্প পরিমাণ শুক্রাণুর প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর জন্য নুতফাহ তথা অতি সামান্য পরিমাণ তরল বীর্যের কথা বলা হয়েছে । আল্লাহ তা’আলা বলেছেন :
خَلَقَ ٱلْإِنسَٰنَ مِن نُّطْفَةٍ
“He has created man from a sperm-drop; ”
অর্থঃ “তিনি মানবকে এক ফোটা বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছেন।”
(সূরা নাহল,আয়াত : ৪)
এছাড়া আল – কুরআনের ১৮ : ৩৭ , ২২ : ৫ , ২৩ : ১৩ , ৩৫ : ১১ , ৩৬ : ৭৭ , ৪০ : ৬৭ , ৫৩ : ৪৬ , ৭৬ : ২ , ৭৬ : ৩৭ , ৮০ : ১৯ আয়াতসমূহে একই ঘোষনার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে।
(ঝ) মানুষকে ‘নুতফাতুন আমশাজ’ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে : আল – কুরআনে মানুষের সৃষ্টিশৈলী বর্ণনা করে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন-
إِنَّا خَلَقْنَا ٱلْإِنسَٰنَ مِن نُّطْفَةٍ أَمْشَاجٍ
“Verily We created Man from a drop of mingled sperm
অর্থঃ “আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্র শুক্রবিন্দু থেকে। “
(সূরা দাহর,আয়াত :২)
আয়াতের نُّطْفَةٍ أَمْشَاجٍ অর্থ হলো মিশ্রিত তরল পদার্থ । আল – কুরআনের তাফসীরকারদের মতে , এখানে মিশ্রিত তরল পদার্থ বলতে পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ নিঃসৃত তরলের মিশ্রণকে বোঝানো হয়েছে । নারী ও পুরুষের ডিম্বাণু ও শুক্রাণু মিশ্রিত হওয়ার পরও ভ্রূণ নুতফাহ আকারে অবস্থান করে । মিশ্রিত তরল পদার্থ দ্বারা শুক্রাণু জাতীয় তরল পদার্থকেও বোঝানো হতে পারে যা বিভিন্ন লালাগ্রন্থির নিঃসরিত রস থেকে তৈরি হয়ে থাকে । এ হিসেবে نُّطْفَةٍ أَمْشَاجٍ দ্বারা বোঝায় নারী ও পুরুষের ডিম্বাণু ও শুক্রাণু এবং এগুলোর চারপাশের তরল পদার্থের কিছু অংশ ।
(ঞ)মানুষকে সুলালাহ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে : আল – কুরআনে মানুষের জম্ম প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন-
ثُمَّ جَعَلَ نَسْلَهُۥ مِن سُلَٰلَةٍ مِّن مَّآءٍ مَّهِينٍ
“And made his progeny from a quintessence of the nature of a fluid despised. “
অর্থঃ” অতঃপর তিনি তার বংশধর সৃষ্টি করেন তুচ্ছ পানির নির্যাস থেকে।”
(সূরা সাজদাহ,আয়াতঃ৮)
আরবি শব্দ ‘ সুলালা’র তিনটি ভিন্ন ভিন্ন অর্থ রয়েছে । এর অর্থ একটি তরলের সাধারণ নির্যাস , স্বল্প পরিমাণ তরল ও একটি মৎস্য সদৃশ কাঠামো । উল্লেখ্য , মানুষের শুক্রাণু একটি লম্বা আকৃতির মাছের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে । অধিকন্তু প্রত্যেক বীর্যপাতের সময় ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন শুক্রাণু নির্গত হয় , যা থেকে কেবল ২০০ টি শুক্রাণু ৫ মিনিটের মধ্যে নিষিক্তকরণ অঞ্চলে পৌছে যায় । সেসব থেকে কেবল একটি শুক্রাণুকেই ডিম্বাণুর সঙ্গে নিষিক্তকরণের জন্য নিংড়ে নেওয়া হয় । অধিকন্তু শুক্রাণুগুলো সামান্য পরিমাণ তরলের রূপ ধারণ করে , যা ৩.৫ থেকে ৫.০ মিলিমিটারের বেশি নয় । অতএব কারণে কুরআনের ‘সুলালা ‘ শব্দটি কেবল যথার্থ বর্ণনাই প্রদান করে না ; বরং এই উপধাপের অঙ্গসংস্থান এবং শরীরতাত্ত্বিক গঠনকেও নির্দেশ করে । আরো উল্লেখ্য , কুরআন মজিদ এই ধাপে কেবল পুরুষের বীর্য সম্পর্কে নির্দেশ করে । আর তাও ভ্রূণবিদ্যার সাম্প্রতিক জ্ঞানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ।
♦️১.৩ বিস্ময়কর মানবদেহের উপাদান
মানব শরীর সত্যি বিস্ময়কর। এটি একটি অভূতপূর্ব মেশিন। এই আশ্চর্য মেশিনটাকে ঢেকে রাখা হয়েছে একটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পোশাক দিয়ে, যার নাম চামড়া। এর উপরিভাগে আবার রয়েছে ১ কোটি লোমকূপ।
প্রতিদিন মানুষের দেহে চামড়া থেকে ঝরে পড়ে অসংখ্য মৃত ত্বক-কোষ। হিসেব করে দেখা গেছে, একজন পূর্ণবয়স্ক দেহ থেকে প্রতি ঘন্টায় ঝরে পড়ে প্রায় ৬ লক্ষ ত্বক-কোষ। এক বছরে ওই ঝরে পড়ার ত্বক-কোষের ওজন দাঁড়ায় প্রায় পাউন্ড।একজন মানুষের দেহে চামড়া রয়েছে ২০ বর্গফুট।
মানব দেহকে সচল রাখার জন্য যে পরিমাণ ফসফরাস আল্লাহপাক দিয়েছেন তা দিয়ে ২২০০ দিয়াশালায় বানানো যাবে। যে পরিমাণ চর্বি আছে তা দিয়ে বড় মাপের ৭টি কেক,১টি কাপড় কাচার সাবান ও ৭৬ টি মোমবাতি বানানো যাবে এবং পানি দেওয়া হয়েছে ১০ গ্যালন। যে পরিমাণ কার্বন আছে তা দিয়ে ৯০০০টি পেন্সিলের শিস তৈরি করা যাবে। যে পরিমাণ লোহা আছে তা দিয়ে বড় ধরনের ২ ইঞ্চি পেরেক তৈরি করা যাবে। যে পরিমাণ বিদ্যুৎ আছে তা দিয়ে ২৫ পাওয়ারের একটি বাল্বকে অন্তত পাঁচ মিনিট সময় জ্বালিয়ে রাখা সম্ভব।
এই মানুষ শ্বাস-নিঃশ্বাস জন্য যে পরিমাণ বাতাস ব্যবহার করে, তা দিয়ে ৩৫ লক্ষ বেলুন ফোলানো যাবে। এই দেহে যে পরিমাণ চুন আছে, তা দিয়ে একটি ঘরকে অনায়াসে চুনকাম করা যেতে পারে। শরীরে গন্ধক আছে দশতলা। লবণ আছে প্রায় ৬ চামুচ। রক্ত আছে ৪ গ্যালন। আর হাড় আছে শিশু বয়স ২০৭ টি। কিন্তু বয়স বাড়লে তা কমে দাঁড়ায় ২০৬ টিতে।
প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্কের ১৪ বিলিয়ন নার্ভসেল আছে এরমধ্যে ব্যবহার হয় মাত্র ৭০ লক্ষ সেল। মস্তিষ্কের মেমোরি সেল প্রতিটি সেকেন্ডে ১০ টি নতুন তথ্যকে স্থান করে দিয়ে থাকে। মানুষের দেহে মোট গিরার পরিমাণ আছে ১০০টি। এ গিরা না থাকলে কোন দিকে বাঁকানো যেত না। আমাদের শরীরে যত ধমনী, শিরা-উপশিরা রয়েছে, তার সবগুলোকে বাইরে এনে একটা সাথে একটাকে জড়িয়ে লম্বা করতে থাকলে এর পরিমাণ হবে ৬০ হাজার মাইল। অর্থাৎ একটি মানুষের শরীরের শিরা- উপশিরা দিয়ে একজন মানুষ গোটা পৃথিবীর প্রায় ৩ বার ঘুরে আসতে পারবেন। একজন মানুষের শরীরে রক্ত চলাচলের জন্য যে শিরা বানানো হয়েছে, তার সবগুলোকে পাশাপাশি সাজালে দেড় একর জমির প্রয়োজন হবে। মানবদেহে প্রতিদিন ২০০ বিলিয়ন নতুন রক্ত কণিকা উৎপন্ন হচ্ছে।
একটি কম্পিউটার খুললে আমরা দেখতে পাই , অসংখ্য তার সংযােজন করে কার্য সম্পাদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে । তেমনি মানবদেহের মস্তিষ্কের সাথে সংযােজিত রয়েছে , শিরা , উপশিরা , ধমনী , স্নায়ু ইত্যাদি বহুরূপী অসংখ্য তার ।ফলে আমরা যাবতীয় কার্য সম্পাদন করতে পারি । এখন প্রশ্ন , মানবদেহের এই সংখ্য শিরা , উপশিরা , ধমনী , স্নায়ু ইত্যাদি এত সুন্দর – সুশৃঙ্খল – সুনিপুণভাবে সংযােজন করলেন কে ? একটি কম্পিউটারের যদি একজন আবিষ্কারক থেকে থাকেন , তবে মানবদেহের মতাে এত নিখুঁত – নির্ভুল – নিপুণ কম্পিউটারের কোনই সৃষ্টিকর্তা নেই , এটি কোন্ যুক্তিতেই টেকে ?
মানুষের চোয়াল এতই শক্তিশালী যে, প্রতিবারে ২৭৯ কেজি ওজন বলপ্রয়োগ করতে পারে। হাড়গুলো স্টিলের চেয়েও শক্ত। আমাদের রুচিবোধের জন্য অর্থাৎ কোনটা আমরা পছন্দ করি, কোনটা আমরা অপছন্দ করি এটি বলে দেওয়ার জন্য রয়েছি ৯০০০ ছোট সেল। গুলোকে যথারীতি সাহায্য করার জন্য রয়েছে আরও ১ কোটি ৩০ লক্ষ নার্ভসেল।
মানুষের মস্তিষ্ক ১০ ওয়াটের বাল্বকে সমান শক্তি প্রয়োগ করে। মানুষের ফুসফুস থেকে বের হওয়ার বায়ুর তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এবং হাতের ছালের তাপমাত্রা ২৫- ৩০ সেন্টিগ্রেড। দেহের অনুভূতির জন্য ৪০ লক্ষ বহুর্মূখী সেল দিয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানবদেহে আল্লাহ তা ‘আলা যে কত কিছু দান করেছেন, সে সম্পর্কে বণর্না করলে বিশালাকৃতির গ্রন্থ রচিত হবে। আল্লাহ পাক কুরআনে বলেছেন,
ٱلَّذِى خَلَقَكَ فَسَوَّىٰكَ فَعَدَلَكَ
“Him Who created thee. Fashioned thee in due proportion, and gave thee a just bias;”
অর্থঃ “যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুবিন্যস্ত করেছেন এবং সুষম করেছেন।”
(সূরা আল ইনফিতার :আয়াত ৭)
যিনি দয়া করে, অনুগ্রহ করে মানুষকে এত সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন, তার দেহের প্রতিটি অঙ্গ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করেছেন, এই পৃথিবীতে সে যেন জীবন ধারণ করতে পারে সে ব্যবস্থা করেছেন, যাবতীয় ব্যবস্থা যিনি করে যাচ্ছেন, তাঁর দাসত্ব না করে মানুষ নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী জীবন পরিচালিত করছে। আল্লাহর বিধানের বিপরীত পন্থায় যাবতীয় কাজকর্ম করে যাচ্ছে। একটি বারের জন্যই চিন্তা করছে না যিনি তাকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব দান করেছেন, প্রতি মুহূর্তে জন্য করুণা ধারায় সিক্ত করেছেন, তার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত।
আমরা কি কখনাে চিন্তা করেছি যে , কোন সে বৈজ্ঞানিক যিনি মায়ের গর্ভে গভীর অন্ধকার প্রকষ্ঠে শুক্রাণু থেকে এরূপ বিস্ময়কর শিল্প নৈপুণ্যে ভরা মানুষ সৃষ্টি করলেন ? কোন সন্দেহ নেই যে , তিনিই হচ্ছেন আল্লাহ।
সহায়ক গ্রন্থসমূহ-
১.১ সাইন্টিফিক আল কুরআন,পৃষ্ঠাঃ৫৩
মানবদেহের ঘটনাবলী,পৃষ্ঠাঃ০৫
পএিকাঃবার্তা ২৪(২২/০৬/২০২২)
১.২ আল-কুরআন ও হাদীসে বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা, পৃষ্ঠাঃ১২৩
আল কুরআনের ১৬০ মুজিজা ও রহস্য,পৃষ্ঠাঃ১০০
১.৩ তাফসীরে সাঈদী(আমপারা), পৃষ্ঠাঃ২০৮
যুক্তির নিরিখে সৃষ্টার অস্তিত্ব,পৃষ্ঠাঃ৮৮
Lots of ThaX.Informative.